ঢাকা ০৫:৩৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৪ আশ্বিন ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

গোদাগাড়ীতে বীজতলায় চারা তৈরি ও পরিচর্যায় ব্যস্ত টমেটো চাষিরা

নিজস্ব প্রতিনিধি
  • আপডেট সময় : ০৩:২৮:৩৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২২ ৮৫ বার পড়া হয়েছে
আজকের জার্নাল অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

সানোয়ার আরিফ রাজশাহী : টমেটোর অঙ্গরাজ্য হিসেবে খ্যাত রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলা। দেশের সিংহভাগ টমেটো উৎপাদন হয় এই উপজেলায়। শীতকালীন সবজি টমেটো আগাম চাষাবাদ করার জন্য বীজতলায় চারা তৈরি ও পরিচর্যা করতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে এ উপজেলার টমেটো চাষিরা।

গোদাগাড়ী উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি টমেটোর মৌসুমে এ উপজেলায় টমেটো চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৫০ হেক্টর। গত মৌসুমে টমেটো চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল দুই হাজার ৯৫০ হেক্টর। তার আগের বছর লক্ষ্যমাত্রা ছিল দুই হাজার ৬৫০ হেক্টর। চাষ হয়েছিল দুই হাজার ৯৫০ হেক্টর। তবে কৃষি অফিস বলছে চলতি বছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি টমেটো চাষের সম্ভাবনা রয়েছে।

সরেজমিনে উপজেলার হেলিপ্যাড, পাহাড়পুর, সাধুরমোড়, বিদিরপুর, পিরিজপুর, গোপালপুল, ভাটোপাড়াসহ বেশ কয়েকটি গ্রাম ঘুরে টমেটোর বীজতলা নিয়ে চাষিদের কর্মব্যস্ততার দৃশ্য দেখা যায়। চাষিরা নানামুখী কাজের ফাঁকে ব্যস্ত বীজতলা নিয়ে। কাকডাকা ভোরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে বীজতলায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। কাঁচি, কোদাল, আনুষঙ্গিক সরঞ্জামাদি নিয়ে নেমে পড়ছেন জমিতে। কেউ কেউ প্রস্তুত করছে বীজতলার জন্য জমি। আবার কেউ গজিয়ে উঠা টমেটোর চারায় পানি দিচ্ছে। অনেকেই ব্যস্ত বীজতলা পরিচর্যায়। এদিকে পুরুষের পাশাপাশি এ কাজে নারীদেরও দেখা মেলে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বীজতলা প্রস্তুতের পর জমির মাঝ বরাবর নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে বীজ রোপণ করা হয়েছে। এরপর বাঁশের তৈরি ‘বেড়া’ রিংয়ের মতো বসিয়ে ওপরে পলিথিন দিয়ে পুরো বীজতলা মুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

টমেটো চাষিরা বলেন, গরম পরিবেশ সৃষ্টি করতে পলিথিন দিয়ে বীজতলা ঢেকে দেওয়া হয়। মাঝে মাঝে ঢেকে দেওয়া পলিথিনগুলো সামান্য উঠিয়ে এক পাশ ফাঁকা করে দেওয়া হয়। যেন বাইরের বাতাস বীজতলায় প্রবেশ করতে পারে। বীজ রোপণ থেকে শুরু করে প্রথম এক সপ্তাহের মতো এ কার্যক্রম চলে। বীজ গজিয়ে ওঠার পর চাষিরা সেই পলিথিনগুলো সরিয়ে ফেলেন। এরপর নিয়মিত চলে পরিচর্যা।

বীজ শোধন করা যেতে পারে কয়েক পদ্ধতিতে। ছত্রাকনাশক প্রোভেক্স দ্বারা বীজ শোধন করা সহজ পদ্ধতি। এ ছাড়া গরম পানিতে বীজ ভিজিয়ে শোধন করাও সহজ। ৫০০ সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রার গরম পানিতে ৩০ মিনিট টমেটোর বীজ ভিজিয়ে রাখলে ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের জীবাণু মারা যায়। এরপর গরম পানি থেকে বীজ তুলে ছায়ায় শুকিয়ে বপন করতে হবে। আর বীজতলার মাটি চাষ দিয়ে তাতে জৈবসার মিশিয়ে পলিথিন দিয়ে দু’সপ্তাহ ভালো করে ঢেকে রেখে দিলে সূর্যেও তাপে মাটিতে থাকা অনেক জীবাণু মারা যায় ও বীজতলার মাটি শোধন হয়ে যায়। ফরমালিন দিয়েও বীজতলার মাটি শোধন করা যায়।

বীজতলা তৈরি ও সার ব্যবস্থাপনা : বীজতলার জন্য বেলে দোআঁশ মাটি সবচেয়ে ভালো। রোদযুক্ত উঁচু জায়গা পরিষ্কার করে ভালোভাবে মাটি চাষ দিয়ে বীজতলা তৈরি করতে হবে। টমেটোর জন্য গোবর সার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যথেষ্ট পরিমাণ পচা গোবর ও অন্যান্য রাসায়নিক সার দিয়ে মাটির সঙ্গে ভালোভাবে মিশে দিতে হবে। চাষের পর এক মিটার চওড়া এবং ৬-১০ ইঞ্চি উঁচু করে সিড বেড বানাতে হবে। সিড বেডের দৈর্ঘ্য প্রয়োজন মতো হতে পারে। সিড বেডে যাতে কোনো অবস্থায় পানি আটকে না থাকতে পারে তার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতি বর্গমিটার বীজতলার জন্য ১.৫ কেজি পচা গোবর, ৪০ গ্রাম ইউরিয়া, ৩০ গ্রাম টিএসপি ও ২০ গ্রাম এমওপি প্রয়োগ করতে হবে। চারার সঠিক বৃদ্ধির জন্য চারা গজানোর ১০-১২ দিন পর ইউরিয়া সার পানির সঙ্গে মিশিয়ে (১.৫%) স্প্রে করতে হবে।

অন্যান্য ব্যবস্থাপনা : অনেক ক্ষেত্রে টমেটোর বীজ বপন করার পর পিঁপড়া বীজ নিয়ে যায় ফলে অঙ্কুুরোদগম কম হয়। তাই সর্তকতা স্বরূপ বীজতলার চারিদিকে সেভিন ডাস্ট ছিটিয়ে দিলে ঝুঁকি থাকে না। বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকলে সাদা পলিথিনের ছাউনির ব্যবস্থা করতে হবে। মোটা ও সবল চারা পেতে হলে ৮-১০ দিন বয়সের চারা তুলে অন্য বীজতলায় দুই ইঞ্চি দূরে দূরে পুনরায় লাগাতে হবে যাকে বলান বলা হয়। বলান করা চারা মোটা ও সবল হয়। বলান করা চারা জমিতে রোপণ করলে বাঁচার হার ১০০%। বীজতলার মাটি স্যাঁতসেঁতে থাকলে অনেক সময় চারায় পাতাপচা বা গোড়াপচা রোগ হতে পারে। গোড়াপচা ও পাতাপচা রোগ দমনের জন্য ডাইথেন-এম ৪৫ অনুমোদিত মাত্রা অনুসারে গাছ ভিজিয়ে স্প্রে করতে হবে। ২৫-৩০ দিন বয়সের চারা বিকেলে লাগানো উত্তম।

গোদাগাড়ী উপজেলা কৃষি অফিসের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আবুল হোসেন জানান, আমরা সব সময় কৃষকের সঙ্গে রয়েছি। আগাম জাতের ও টমেটো ক্যারেট করা যায় এমন জাতের টমেটো চাষের জন্য কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। কৃষকরা যেন আগাম টমেটো ক্ষেত থেকে উত্তোলন করতে পারে। এতে কৃষকরা টমেটোর ভালো দাম পাবে।

তিনি আরও বলেন, এ সময় কোনো অসাধু বীজ ব্যবসা বীজ নিয়ে কৃষকদের সঙ্গে যেন প্রতারণা করতে না পারে সেজন্য মাঠ পর্যায়ে মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

গোদাগাড়ীতে বীজতলায় চারা তৈরি ও পরিচর্যায় ব্যস্ত টমেটো চাষিরা

আপডেট সময় : ০৩:২৮:৩৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২২

সানোয়ার আরিফ রাজশাহী : টমেটোর অঙ্গরাজ্য হিসেবে খ্যাত রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলা। দেশের সিংহভাগ টমেটো উৎপাদন হয় এই উপজেলায়। শীতকালীন সবজি টমেটো আগাম চাষাবাদ করার জন্য বীজতলায় চারা তৈরি ও পরিচর্যা করতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে এ উপজেলার টমেটো চাষিরা।

গোদাগাড়ী উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি টমেটোর মৌসুমে এ উপজেলায় টমেটো চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৫০ হেক্টর। গত মৌসুমে টমেটো চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল দুই হাজার ৯৫০ হেক্টর। তার আগের বছর লক্ষ্যমাত্রা ছিল দুই হাজার ৬৫০ হেক্টর। চাষ হয়েছিল দুই হাজার ৯৫০ হেক্টর। তবে কৃষি অফিস বলছে চলতি বছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি টমেটো চাষের সম্ভাবনা রয়েছে।

সরেজমিনে উপজেলার হেলিপ্যাড, পাহাড়পুর, সাধুরমোড়, বিদিরপুর, পিরিজপুর, গোপালপুল, ভাটোপাড়াসহ বেশ কয়েকটি গ্রাম ঘুরে টমেটোর বীজতলা নিয়ে চাষিদের কর্মব্যস্ততার দৃশ্য দেখা যায়। চাষিরা নানামুখী কাজের ফাঁকে ব্যস্ত বীজতলা নিয়ে। কাকডাকা ভোরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে বীজতলায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। কাঁচি, কোদাল, আনুষঙ্গিক সরঞ্জামাদি নিয়ে নেমে পড়ছেন জমিতে। কেউ কেউ প্রস্তুত করছে বীজতলার জন্য জমি। আবার কেউ গজিয়ে উঠা টমেটোর চারায় পানি দিচ্ছে। অনেকেই ব্যস্ত বীজতলা পরিচর্যায়। এদিকে পুরুষের পাশাপাশি এ কাজে নারীদেরও দেখা মেলে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বীজতলা প্রস্তুতের পর জমির মাঝ বরাবর নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে বীজ রোপণ করা হয়েছে। এরপর বাঁশের তৈরি ‘বেড়া’ রিংয়ের মতো বসিয়ে ওপরে পলিথিন দিয়ে পুরো বীজতলা মুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

টমেটো চাষিরা বলেন, গরম পরিবেশ সৃষ্টি করতে পলিথিন দিয়ে বীজতলা ঢেকে দেওয়া হয়। মাঝে মাঝে ঢেকে দেওয়া পলিথিনগুলো সামান্য উঠিয়ে এক পাশ ফাঁকা করে দেওয়া হয়। যেন বাইরের বাতাস বীজতলায় প্রবেশ করতে পারে। বীজ রোপণ থেকে শুরু করে প্রথম এক সপ্তাহের মতো এ কার্যক্রম চলে। বীজ গজিয়ে ওঠার পর চাষিরা সেই পলিথিনগুলো সরিয়ে ফেলেন। এরপর নিয়মিত চলে পরিচর্যা।

বীজ শোধন করা যেতে পারে কয়েক পদ্ধতিতে। ছত্রাকনাশক প্রোভেক্স দ্বারা বীজ শোধন করা সহজ পদ্ধতি। এ ছাড়া গরম পানিতে বীজ ভিজিয়ে শোধন করাও সহজ। ৫০০ সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রার গরম পানিতে ৩০ মিনিট টমেটোর বীজ ভিজিয়ে রাখলে ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের জীবাণু মারা যায়। এরপর গরম পানি থেকে বীজ তুলে ছায়ায় শুকিয়ে বপন করতে হবে। আর বীজতলার মাটি চাষ দিয়ে তাতে জৈবসার মিশিয়ে পলিথিন দিয়ে দু’সপ্তাহ ভালো করে ঢেকে রেখে দিলে সূর্যেও তাপে মাটিতে থাকা অনেক জীবাণু মারা যায় ও বীজতলার মাটি শোধন হয়ে যায়। ফরমালিন দিয়েও বীজতলার মাটি শোধন করা যায়।

বীজতলা তৈরি ও সার ব্যবস্থাপনা : বীজতলার জন্য বেলে দোআঁশ মাটি সবচেয়ে ভালো। রোদযুক্ত উঁচু জায়গা পরিষ্কার করে ভালোভাবে মাটি চাষ দিয়ে বীজতলা তৈরি করতে হবে। টমেটোর জন্য গোবর সার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যথেষ্ট পরিমাণ পচা গোবর ও অন্যান্য রাসায়নিক সার দিয়ে মাটির সঙ্গে ভালোভাবে মিশে দিতে হবে। চাষের পর এক মিটার চওড়া এবং ৬-১০ ইঞ্চি উঁচু করে সিড বেড বানাতে হবে। সিড বেডের দৈর্ঘ্য প্রয়োজন মতো হতে পারে। সিড বেডে যাতে কোনো অবস্থায় পানি আটকে না থাকতে পারে তার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতি বর্গমিটার বীজতলার জন্য ১.৫ কেজি পচা গোবর, ৪০ গ্রাম ইউরিয়া, ৩০ গ্রাম টিএসপি ও ২০ গ্রাম এমওপি প্রয়োগ করতে হবে। চারার সঠিক বৃদ্ধির জন্য চারা গজানোর ১০-১২ দিন পর ইউরিয়া সার পানির সঙ্গে মিশিয়ে (১.৫%) স্প্রে করতে হবে।

অন্যান্য ব্যবস্থাপনা : অনেক ক্ষেত্রে টমেটোর বীজ বপন করার পর পিঁপড়া বীজ নিয়ে যায় ফলে অঙ্কুুরোদগম কম হয়। তাই সর্তকতা স্বরূপ বীজতলার চারিদিকে সেভিন ডাস্ট ছিটিয়ে দিলে ঝুঁকি থাকে না। বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকলে সাদা পলিথিনের ছাউনির ব্যবস্থা করতে হবে। মোটা ও সবল চারা পেতে হলে ৮-১০ দিন বয়সের চারা তুলে অন্য বীজতলায় দুই ইঞ্চি দূরে দূরে পুনরায় লাগাতে হবে যাকে বলান বলা হয়। বলান করা চারা মোটা ও সবল হয়। বলান করা চারা জমিতে রোপণ করলে বাঁচার হার ১০০%। বীজতলার মাটি স্যাঁতসেঁতে থাকলে অনেক সময় চারায় পাতাপচা বা গোড়াপচা রোগ হতে পারে। গোড়াপচা ও পাতাপচা রোগ দমনের জন্য ডাইথেন-এম ৪৫ অনুমোদিত মাত্রা অনুসারে গাছ ভিজিয়ে স্প্রে করতে হবে। ২৫-৩০ দিন বয়সের চারা বিকেলে লাগানো উত্তম।

গোদাগাড়ী উপজেলা কৃষি অফিসের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা আবুল হোসেন জানান, আমরা সব সময় কৃষকের সঙ্গে রয়েছি। আগাম জাতের ও টমেটো ক্যারেট করা যায় এমন জাতের টমেটো চাষের জন্য কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। কৃষকরা যেন আগাম টমেটো ক্ষেত থেকে উত্তোলন করতে পারে। এতে কৃষকরা টমেটোর ভালো দাম পাবে।

তিনি আরও বলেন, এ সময় কোনো অসাধু বীজ ব্যবসা বীজ নিয়ে কৃষকদের সঙ্গে যেন প্রতারণা করতে না পারে সেজন্য মাঠ পর্যায়ে মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে।